হাকিকুল ইসলাম খোকন,বাপসনিউজঃ মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাঙালির ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গৌরবোজ্জল ঘটনা। এই সশস্ত্র সংগ্রামের ফলে বিশ্ব মানচিত্রে রক্তস্নাত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অর্থাৎ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার – এই ত্রয়ী আদর্শের ভিত্তিতে স্বাধীনতার পর থেকে একদিনের জন্যও রাষ্ট্র পরিচালিত হয়নি। রাষ্ট্রকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। বিদ্যমান অগণতান্ত্রিক অমানবিক রাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্ব করে না। খবর আইবিএননিঊজ।
তাই বাঙালির জাতিরাষ্ট্র গঠন, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা নিয়ে অবশ্যই জাতির আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন। দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য বা হত্যা নিপীড়নের মহড়া দেখার জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংঘঠিত হয়নি। উপনিবেশের অধীনতা ছিন্ন করা হয়েছে জাতীয় মুক্তির লক্ষ্য অর্জনের জন্য, নতুন করে নিপীড়ক রাষ্ট্র পুনঃনির্মাণের জন্য নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই শাসকরা পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। রাষ্ট্র বিনির্মাণের মৌলিক দর্শনকে বিলীন করে দিয়েছে।
মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, সেই জাতি মহান যে জাতি মৃত্যুর বালিশ মাথায় রেখে বিশ্রাম করে। যারা মৃত্যুর ভয় ত্যাগ করতে পেরেছে তারা সব কিছুর ভয় থেকে মুক্ত।
ভয়কে ত্যাগ করে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে পাকিস্তানের বুকে দাঁড়িয়ে ১৯৭১ সালের দোসরা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলাম। পতাকা উত্তোলনের সাথে সাথে ছাত্র-জনতার গগনবিদারী শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছিল উত্তাল জনসমুদ্র। জাতির মননে স্বাধীনতার সূর্য উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। জনসমুদ্রের সেই উত্তাল তরঙ্গমালা অবিস্মরনীয় ও অবর্ণনীয়।
বাঙালির জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের স্থপতি বঙ্গবন্ধু। মাওলানা ভাসানির সংগ্রামী জীবনও স্বাধীনতার ইতিহাসের অংশ। চট্টগ্রামে সশস্ত্র বাহিনীতে জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ মুক্তিযুদ্ধকে বেগবান করেছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এর ভূমিকাও অপরিসীম। সর্বোপরি মুক্তিবাহিনী, মুজিব বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনীসহ অন্যান্যদের সাহসী ভূমিকা উজ্জ্বল স্বাক্ষর হয়ে আছে। অন্যদিকে আমাদের স্বাধীনতায় লক্ষ লক্ষ শহীদের আত্মদান ও দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম জড়িত। সুতরাং যে কোন জাতিরাষ্ট্র বহু মানুষের কৃতিত্বে নির্মিত হয়।
পৃথিবীর যেকোন কাজ শুরু হয় মুষ্টিমেয় কয়েকজন এর হাতে। তেমনি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছিল স্বাধীনবাংলা নিউক্লিয়াস নামের তিন সদস্য বিশিষ্ট এক গোপন সংগঠন। জয় বাংলা বাহিনী ও বিএলএফ গঠন, বাংলাদেশের পতাকা তৈরি ও পতাকা উত্তোলন, ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের পরিকল্পনা, স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণাসহ স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জনের ঐতিহাসিক পরিকল্পনার নেপথ্য নায়ক ছিলেন নিউক্লিয়াসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সিরাজুল আলম খান।
জাতি রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে গোপন সংগঠনটি শুরুতেই সশস্ত্র সংগ্রামে অবর্তীর্ণ হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে ধাপে ধাপে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তীব্র থেকে তীব্রতর করে জনগণকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ‘জয় বাংলা’ এবং ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এসব স্লোগান দিয়ে যুব সমাজের মনে স্বাধীনতার স্বপ্ন বপন ও সশস্ত্র সংগ্রামের মনন তৈরি করে। এসব অগণিত কর্মকাণ্ড ছাত্রদের মাঝে সংগ্রামী চেতনা, অনুপ্রেরণা ও সাহস যোগায়।
ছাত্রলীগের মাঝে দুটি ধারা ছিল। একটি ধারা স্বায়ত্তশাসন ও আপোসকামী, আরেকটি সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের ধারা। আপোসকামী ধারা বিজয়ী হলে বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্ন কবেই তিরোহিত হয়ে যেত।
উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসেও দুটো ধারা সবসময় বিদ্যমান ছিল। একটা আপোসকামিতা আর একটা ছিল আপোসহীনতা। সিরাজুল আলম খান ও নিউক্লিয়াস প্রতিনিধিত্ব করেন আপোসহীনতার।
স্বাধীনতার লক্ষ্যে সুপরিকল্পিতভাবে ছাত্র-যুবসমাজের মনে সশস্ত্র সংগ্রামের অগ্নিশিখা ছড়িয়ে দিতে না পারলে হঠাৎ করে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে আবদ্ধ একটি জাতি সশস্ত্র সংগ্রামে রূপান্তরিত হতে পারতো না। প্রকাশ্য ও গোপন সংগঠনের অসংখ্য কর্মকাণ্ডকে সম্পৃক্ত করে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনতে হয়েছে।
উপমহাদেশে নেতাজি সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ ও প্রবাসী সরকার গঠনে ভারতের আপসকামী নেতারা সুভাষ বসুর তীব্র সমালোচনা করতেন। আজ নেতাজি ভারতের স্বাধীনতার অগ্নিপুরুষ, স্বাধীনতাযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। ইতিহাস প্রমাণ করেছে তার অবদান সবার ঊর্ধ্বে ।
সুতরাং বাংলাদেশে যারা স্বাধীনতার দুটো ধারার ঐতিহাসিক কার্যক্রম জানেন না, যারা নিউক্লিয়াসের সাথে সম্পৃক্ত নন, অথচ মনের মাধুরী মিশিয়ে ঐতিহাসিক ঘটনাবলীকে অস্বীকার করে অসত্য বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন, তারা ভবিষ্যতে ইতিহাস বিকৃতির ভয়ঙ্কর অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। কেউ কেউ সিরাজুল আলম খান ও নিউক্লিয়াসের ঐতিহাসিক ভূমিকা অস্বীকার করেন ইতিহাস থেকে ঝরে পড়ার ভয়ে।
আমরা ভৌগলিক স্বাধীনতা লাভ করেছি। কিন্তু রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সামাজিক সাম্য ও অর্থনৈতিক মুক্তির প্রশ্নে আমরা এখনো দূরবর্তী। রাষ্ট্রের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আমরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দর্শনের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করতে পারিনি। স্বাধীনতা মানে আর্থ সামাজিক অসাম্য ও অবিচার থেকে চিরতরে মুক্তি।উপরের কথা গুলো বলেছেন জেএসএফ সংগঠক হাজী আনোয়ার হোসেন লিটন।
