হ-বাংলা নিউজ: মাত্র ১৩ বছর বয়সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালীন বিয়ে করেছিলেন নাছিমা খানম। ৬ বছরের দাম্পত্য জীবনে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন তার স্বামী। তখন তিনি তিন সন্তানের মা ছিলেন এবং গর্ভে ছিল একটি অনাগত সন্তান। স্বামীহীন হয়ে জীবনযাত্রা চালানো ছিল তার জন্য কঠিন, তবে তার অদম্য সংগ্রাম তাকে এক নতুন জীবন উপহার দেয়। সন্তানদের জন্য একসময় নিজের রক্ত বিক্রি করেছেন, বাসাবাড়িতে কাজ করেছেন, কিন্তু সেই সংগ্রাম থেকেই তিনি উঠে এসেছেন। আজকের নাছিমা খানম কুমিল্লার এক সফল নারী উদ্যোক্তা এবং কোটিপতি।
সম্প্রতি কুমিল্লার মনোহরপুর হাজী প্লাজায় জুলি লেডিস টেইলার্সে গিয়ে তার সংগ্রামী জীবন নিয়ে কথা হয়। নাছিমা জানান, ‘‘১৯৬৯ সালে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে জন্ম। ১৯৮৮ সালে স্বামীকে হত্যার পর তিনটি ছোট সন্তান নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে ঠাঁই না পেয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিই। সেখানে একদিকে সংসারের অভাব আর অন্যদিকে ঠাঁই না হওয়া—দু’ বছর পর সেখানে থাকা আর সম্ভব ছিল না।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এ সময় কুমিল্লা নগরীতে থাকা এক দূরসম্পর্কের খালার পরামর্শে ১৯৯০ সালে আমি কুমিল্লা শহরে আসি। তখন আমার কাছে ছিল মাত্র ১০০ টাকা। কুমিল্লা হাউজিং স্টেটে একটি ছোট বাসায় উঠি। সেখান থেকেই শুরু হয় আমার সংগ্রামের নতুন অধ্যায়। সন্তানদের স্কুলে ভর্তি এবং খাবার জোগাড় করতে শরীরের রক্ত বিক্রি করতে শুরু করি। প্রতি ব্যাগ রক্ত বিক্রি করতাম ২০০ টাকায়, প্রায় ১৫-১৬ ব্যাগ রক্ত বিক্রি করেছি।’’
তিনি বলেন, ‘‘এই সময়েই আমি সন্তানদের জন্য প্রতিদিনের খাবার জোগাতে এবং তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কঠিন সংগ্রাম করি। আমার বড় দুই ছেলে এইচএসসি এবং এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে, যদিও এক ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।’’
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে অস্থায়ী কাজ করার পর, নাছিমা যুব উন্নয়ন থেকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ নেন এবং বাড়িতে বসেই সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার বড় ছেলে মাছুম রানা আমাকে সহায়তা করত। আমরা মা-ছেলে একযোগে কঠোর পরিশ্রম করতাম।’’
এক পর্যায়ে, নাছিমা এক নারী সেনা কর্মকর্তার সাথে পরিচিত হন, যিনি তার কাজ পছন্দ করে তাকে টেইলার্সের দোকান চালানোর পরামর্শ দেন। এরপর কুমিল্লা নিউ মার্কেটে একটি দোকান ভাড়া নিয়ে ‘আমিন টেইলার্স’ নামে কাজ শুরু করেন। এক কাঁচি আর ফিতা নিয়ে শুরু হওয়া এই ব্যবসা আজ অনেক বড় হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে, নাছিমা নিজে ‘জুলি টেইলার্স’-এর মালিক, যেখানে ১০ জন কর্মী কাজ করেন। এছাড়া রেসকোর্সে তিনটি দোকান ও কারখানায় ২০ জন কর্মী কাজ করছে। তার ব্যবসার আয় থেকে তিনি কুমিল্লা শহর এবং গ্রামের বাড়িতে জমি কিনেছেন এবং এখন তার সম্পদের পরিমাণ দেড় কোটিরও বেশি।
নাছিমা জানান, ‘‘আমি ২৫০ জন বেকার নারীকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আত্মনির্ভরশীল।’’
কুমিল্লার তরী সামাজিক বুননের সমন্বয়ক রেজবাউল হক রানা বলেন, ‘‘নাছিমার মতো একজন সংগ্রামী নারী, যিনি জীবনের কঠিন সংগ্রামকে জয় করে আজকের সফলতার দিকে এগিয়ে গেছেন, তার গল্প আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে।’’
