হ-বাংলা নিউজ: এ কে এম রেজাউল করিম
চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
বাংলাদেশের আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে আবরার ফাহাদ হত্যা অন্যতম। এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু থেকেই রাজনৈতিক বিতর্কে ঘেরা। সাম্প্রতিক সময়ে, এই মামলায় সাত আসামির পক্ষে সুপরিচিত আইনজীবী শিশির মনিরের দাঁড়ানো নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
আইনজীবীর পেশাগত স্বাধীনতা বনাম নৈতিকতার প্রশ্ন
প্রত্যেক নাগরিকের আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যেকোনো আইনজীবী তার পছন্দ অনুযায়ী মামলা নিতে পারেন। এটি তার পেশাগত অধিকার। কিন্তু যখন কোনো আইনজীবীর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও সক্রিয়তা সংশ্লিষ্ট মামলার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন তা নৈতিক দ্বন্দ্ব তৈরি করে। শিশির মনির, যিনি নিজেই আবরার হত্যার বিচার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন, এখন সেই হত্যার আসামিদের পক্ষ নিচ্ছেন—এটি কতটা গ্রহণযোগ্য?
বিচারের দাবিতে রাজপথে থাকা একজন ব্যক্তি যদি আদালতে সেই অপরাধীদের পক্ষে দাঁড়ান, তাহলে তার পেশাগত ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়। এটি কি শুধুই পেশাদারিত্ব, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো অভিসন্ধি রয়েছে—এই প্রশ্নও ওঠে।
নিন্দিত আসামিদের পক্ষে লড়াই কতটা যৌক্তিক?
এই সাত আসামির মধ্যে কেউ কেউ সরাসরি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছেন, কেউ আবার হত্যার আদেশ দিয়েছেন। তৎকালীন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল লাশ গুম ও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। মেহেদী হাসান রবিন আবরারকে গেস্টরুমে আনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অমিত সাহা মারধরের নির্দেশ দেন এবং আরো দুই ঘণ্টা নির্যাতন চালানোর পরামর্শ দেন। মাহমুদ সেতু আবরারের নির্যাতন চলতে থাকার পক্ষে মত দেন।
এই অবস্থায়, প্রশ্ন ওঠে—শিশির মনির কি সত্যিই মনে করেন যে এরা নিরপরাধ? নাকি এটি কেবল তার রাজনৈতিক ও পেশাগত অবস্থানের সুবিধাবাদী প্রয়োগ?
সরকারি চাপে রায় নাকি ন্যায়বিচার?
কিছু মহল থেকে বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকার জনতুষ্টির জন্য এই রায় দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তৎকালীন আইনমন্ত্রী নিজেই কয়েকজন আসামির সাজা কমানোর চেষ্টা করেছিলেন, তবে বিচারক দৃঢ় অবস্থান নেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
এই মামলায় ২৫ জনকে আসামি করা হলেও প্রকৃতপক্ষে হত্যার দায় অনেক বেশি মানুষের ওপর বর্তায়। শতাধিক আসামি হলে সেটিই হতো প্রকৃত বিচারের প্রতিফলন।
শিশির মনিরের অবস্থান: রাজনৈতিক সুবিধাবাদ নাকি পেশাদারিত্ব?
বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় আইনজীবীদের পেশাগত মান ও নৈতিকতা নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। রফিকুল হক ছিলেন এমন একজন ব্যতিক্রমী আইনজীবী, যিনি আইনের ব্যাখ্যার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন, আসামিদের খালাস করাই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল না।
অন্যদিকে, শিশির মনির একজন সুপরিচিত জামায়াতপন্থী আইনজীবী। তিনি একদিকে রাজপথে জামায়াতের পক্ষে সক্রিয়, অন্যদিকে আদালতে তাদের বিরোধীদেরও প্রতিনিধিত্ব করেন। এটি কি সত্যিই পেশাদারিত্ব, নাকি সুবিধাবাদ?
এটি শুধু আবরার হত্যার বিচারপ্রাপ্তির প্রশ্ন নয়; এটি নৈতিকতারও প্রশ্ন। শিশির মনিরের এই দ্বৈত ভূমিকা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য? এই প্রশ্নের উত্তর দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
বাংলাদেশের আইন পেশার মান ও নৈতিকতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, শিশির মনিরের মতো একজন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আইনজীবীর এই মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী হওয়া শুধু বিচার ব্যবস্থার নয়, তার নিজের পেশাদারিত্বেরও নৈতিক পরীক্ষা।
এই মামলার রায়কে বিতর্কিত করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তা ন্যায়বিচারকে ব্যাহত করতে পারে। আইনজীবীদের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত, তবে সেই স্বাধীনতা যেন নৈতিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

