হ-বাংলা নিউজ: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার দেশের সকল ক্ষেত্রে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করা প্রয়োজন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট এবং বাংলাদেশ সরকারের তাদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়েও মন্তব্য করেছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
৩০ নভেম্বর নিক্কেই এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ড. ইউনূস। সাক্ষাৎকারটি সোমবার প্রকাশিত হয়।
ড. ইউনূস বলেন, “বাংলাদেশ কতদিন রোহিঙ্গা সংকটের দায় বহন করবে?” তিনি উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য নির্ধারণ করতে হবে। মিয়ানমারে জাতিসংঘ-শাসিত নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশ, যা তাদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার যদি রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সম্মত হয়, তবে তারা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকতে পারবে, এবং সেখানকার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তারা অন্য দেশে স্থানান্তরিত না হয়ে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারবে।
ড. ইউনূস বাংলাদেশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর সংস্থা (আসিয়ান) সদস্যপদ নেওয়ার পক্ষে জোর দেন। তিনি জানান, ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আসিয়ানের সভাপতি মালয়েশিয়া আগামী জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করবে, এবং তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি জানান, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদানের প্রথম পদক্ষেপ হবে একটি সর্বসম্মত রেজুলেশন পাস করা, এবং বাংলাদেশ আসিয়ানে একটি সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আশাবাদী।
শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশের পরিস্থিতি উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, “হাসিনা সরকার সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।” তিনি নির্বাচনী সংশোধনীসহ সাংবিধানিক এবং বিচারিক সংস্কারের পর সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি জানান, নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র এবং বিচারব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক কমিশন গঠন করেছে, যা নির্বাচনী ব্যবস্থা, সংবিধান এবং বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের সুপারিশ করবে। ড. ইউনূস বলেন, কমিশনগুলোর সুপারিশ জানুয়ারির মধ্যে হাতে আসবে এবং সরকার সেগুলো অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। তবে তিনি জানান, এই সংস্কার বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে, কারণ নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ শুরু করা হয়েছে একদম গোড়া থেকে।
ড. ইউনূস বলেন, তিনি নির্বাচন প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, “আমি রাজনীতিবিদ নই, আমি সবসময় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলাম। রাষ্ট্রের যেসকল ব্যক্তি নীতির প্রতি দায়বদ্ধ, নিয়ম-কানুন অনুসরণ করেন এবং দুর্নীতিমুক্ত, তাদের নির্বাচনে দাঁড়ানো উচিত।”
শেখ হাসিনার শাসনামলে গণতন্ত্রের অবক্ষয় এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, “হাসিনা তিনবার ভোটারবিহীন নির্বাচন করে নিজেকে এবং তার দলকে বিজয়ী ঘোষণা করেছিলেন। এই পদক্ষেপগুলো ফ্যাসিবাদী শাসকের আচরণ ছিল।”
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-নাগরিকদের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনার ১৫ বছরের শাসন শেষ হয়। পরে তিনি ভারতে পালিয়ে যান। ড. ইউনূস জানান, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাসিনা এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
ড. ইউনূস আরও জানান, বিচার শেষে হাসিনার বিষয়ে ভারতকে জানানো হবে, এবং চূড়ান্ত রায় হলে তাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের অনুরোধ করা হবে।
কূটনৈতিক ফ্রন্টে, ড. ইউনূস ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব দেন এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের উত্তেজনা নিরসন করতে আহ্বান জানান।
ভারত সরকারের বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পর, ড. ইউনূস বলেন, “এ ধরনের বক্তব্য অনেকাংশে প্রোপাগান্ডা।” তিনি ভারতীয় সাংবাদিকদের বাংলাদেশে এসে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করার আহ্বান জানান।
ড. ইউনূস চীনকে বাংলাদেশের বন্ধু দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “চীন আমাদের নানা ক্ষেত্রে সহায়তা করেছে, যেমন সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, এবং সমুদ্রবন্দর।” তিনি জানান, বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক আগের মতোই অব্যাহত থাকবে।
