আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি, র্যাগিং, মাদক বেচাকেনা ও হলের আসন দখল—এমন একাধিক নেতিবাচক ঘটনার জন্ম দিয়ে এক মাসের ব্যবধানে আলোচনায় এসেছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। তাঁরা বেপরোয়া আচরণ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কারও বিরুদ্ধে টুঁ শব্দও করে না বলে অভিযোগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের অভিমত, মূলত দুটি কারণে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে অস্থিরতা বেড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি এবং অপকর্মে জড়িত নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া।সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নাজমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শাবিপ্রবি শাখা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের ইউনিট। দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নতুন কমিটি গঠিত হলে সব সমস্যার সমাধান হবে। দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিটি দিতে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে অনুরোধ জানান তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক মাসে র্যাগিং, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও হল থেকে শিক্ষার্থী বের করে দেওয়ার মতো তিনটি ঘটনার জন্ম দিয়েছেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এমনকি ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ একে অন্যের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি মামলাও করেছে।
ছাত্রলীগ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৫ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিজেদের মধ্যে অন্তত তিনটি সংঘর্ষে জড়ান ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক উপদপ্তর সম্পাদক সজিবুর রহমানের অনুসারীরা দুটিতে ও সাবেক পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক খলিলুর রহমান, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সুমন মিয়া ও রসায়ন বিভাগ ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান ওরফে স্বাধীনের অনুসারীরা একটি করে সংঘর্ষে জড়ান। এসব সংঘর্ষের পেছনে ছিল মূলত আধিপত্য বিস্তার। ছাত্রলীগের নেতা খলিলুর রহমান ও সজিবুর রহমান বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ এখন সুসংহত। সেই অর্থে মারামারি হয় না। সামান্য সমস্যা হলেও নিজেরা বসে সমাধান করে নেওয়া হয়। এ ছাড়া র্যাগিং, মাদক বেচাকেনা বা হলের আসন দখলে ছাত্রলীগের কোনো নেতা-কর্মী জড়িত নন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজতবা আলী হলে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের এক ছাত্রকে র্যাগিং করার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ২২ ফেব্রুয়ারি পাঁচ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে কর্তৃপক্ষ। বহিষ্কৃতরা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগ নেতাদের দাবি, বহিষ্কৃতদের মধ্যে তিনজন তাঁদের কর্মী। ছাত্রলীগের বাইরেও অন্য ছাত্রসংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীও আছেন। তাই এটিকে দলীয় ‘ট্যাগ’ দেওয়া ঠিক নয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৩ সালের ৮ মে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাত সদস্যবিশিষ্ট কমিটির অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। এরপর ২০১৬ সালে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। ২০২১ সালে সেই কমিটি বিলুপ্ত হয়। এরপর কমিটি না হওয়ায় দলীয় বিভক্তি বেড়েছে। নেতৃত্বহীন হওয়ায় বিশৃঙ্খলা থামানো যাচ্ছে না। অভিযোগ আছে, ছাত্রলীগের ছয়টি পক্ষের নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্র হলের ৮০ ভাগ আসন। মিছিলে যাওয়ার শর্তে ছাত্রলীগের ছয়টি পক্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব আসন বিলিবণ্টন করে। হলে কারা আসন পাবেন, সেটা ছাত্রলীগের নেতারাই ঠিক করে দেন।মেহেদী হাসান বলেন, ‘পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ায় মাসখানেক আগে ক্যাম্পাস ছেড়েছি। আসলে দীর্ঘদিন কমিটি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগে একধরনের নেতৃত্বশূন্যতা চলছে। এতে কেউ কারও নির্দেশনা মানছেন না। ফলে টুকটাক সমস্যা হচ্ছে।’ মামুন শাহ বলেন, র্যাগিং ও মাদকের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের অবস্থান জিরো টলারেন্স। মাঝেমধ্যে জুনিয়রদের মধ্যে টুকটাক সমস্যা হয়। বসেই সমাধান করার চেষ্টা করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনও ব্যবস্থা নেয়। ছাত্রলীগের নেতা সুমন মিয়া ও তারেক হালিমী বলেন, কমিটি না থাকায় ছাত্রলীগের মধ্যে দ্বন্দ্ব-রেষারেষি বেড়েছে।প্রক্টর মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, র্যাগিংয়ের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিরো টলারেন্সে আছে। কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রক্টরিয়াল বডি প্রতিদিন ক্যাম্পাস পর্যবেক্ষণ করে। হল কর্তৃপক্ষ সব হলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। কেউ অপকর্ম করলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
