পুন্ড্রা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক সংকট: উপাচার্যের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ও আইনি প্রশ্ন

শিক্ষা সংবাদদাতা

বগুড়ার পুন্ড্রা ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে চলমান প্রশাসনিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত একাধিক গুরুতর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অনুমতি ছাড়াই বিদেশ গমন, স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং ফৌজদারি মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগগুলো এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও সুশাসন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

উপাচার্য ইন্দ্রলালের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি ১৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর অনুমতি ছাড়াই ভারতে গমন করেন, যা সরকারি চাকরি আচরণবিধি ও প্রশাসনিক নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। একই ধরনের ঘটনা ২০২৫ সালেও ঘটেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, এ ধরনের অননুমোদিত বিদেশ গমন ‘misconduct’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা প্রশাসনিক শাস্তির আওতায় পড়ে।

তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, ছাত্র আন্দোলন দমন এবং সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা একটি ফৌজদারি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
📍 আইনি বিশ্লেষণ: কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত থাকা অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল থাকলে তা নৈতিকতা ও প্রশাসনিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সাময়িক বরখাস্ত বা বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক ছুটি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এছাড়া জানা যায়, তিনি ৩০ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে পদত্যাগপত্র জমা দিয়ে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে তা কার্যকর করার অনুরোধ জানান। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও পদত্যাগপত্রটি এখনো কার্যকর হয়নি।
📍 প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ: পদত্যাগ গ্রহণ না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা আইনগতভাবে সম্ভব হলেও, এ ধরনের দীর্ঘসূত্রিতা প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সিদ্ধান্তহীনতার ইঙ্গিত দেয়।

বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ভূমিকাও এ ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। অভিযোগ রয়েছে, বোর্ড চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করছেন।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি, নিজের পুত্রকে যোগ্যতা ছাড়াই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন—যা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়।
আইনি বিশ্লেষণ: এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের আওতায় তদন্তযোগ্য অপরাধ হতে পারে। স্বজনপ্রীতি (Nepotism) প্রশাসনিক নৈতিকতার গুরুতর লঙ্ঘন।

গভীরতর প্রশাসনিক সংকট:
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, রেজিস্ট্রার এবং কোষাধ্যক্ষ—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদই কার্যত শূন্য বা অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসন চলছে মূলত অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ওপর। বেতন কাঠামোতেও নেই স্বচ্ছ ও আইনি প্রক্রিয়া; অভিযোগ রয়েছে, বোর্ড চেয়ারম্যান পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে এককভাবে বেতন নির্ধারণ করছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘন ঘন বদলি এখানে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে—

বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্ন্যান্স কাঠামোর দুর্বলতা
বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অদক্ষতা বা নিষ্ক্রিয়তা
উচ্চশিক্ষা খাতে জবাবদিহিতার ঘাটতি
আশু আইনগত করণীয় (Legal Recommendations):

১. একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন
২. উপাচার্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি তদন্ত শুরু
৩. পদত্যাগপত্র দ্রুত গ্রহণ ও কার্যকর করা
৪. বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কার্যক্রম অডিট ও প্রয়োজনীয় পুনর্গঠন
৫. উচ্চশিক্ষা খাতে শক্তিশালী জবাবদিহিতা কাঠামো প্রণয়ন
৬. সুশিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা

পুন্ড্রা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সংকট কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য—অন্যথায় শিক্ষা খাতে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *