গার্বেজ ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে বাংলাদেশি তরুণীর মৃত্যু নিশাতের জন্য বুকফাটা আর্তনাদ

হাকিকুল ইসলাম খোকন,বাপসনিউজঃ নিউইয়র্কের উডসাইডে গার্বেজ ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে বাংলাদেশি তরুণী নিশাত জান্নাত (১৯) নিহত হয়েছেন। কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে বাসার কাছে ছোট বোনের জন্য কেক কিনতে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার আর ঘরে ফেরা হয়নি। বাসার কাছে ঘাতক গার্বেজ ট্রাক নিশাতকে ধাক্কা দিয়ে চাকার নিচে পিষ্ট করে। খবর আইবিএননিউজ।
যে কোনো মৃত্যু সংবাদই বেদনার, কষ্টের ও শোকের। কিন্তু বাংলাদেশি তরুণী জান্নাতের মর্মান্তিক মৃত্যু সংবাদে শুধু পরিবারের সদস্যরা নয়, স্বজন ও প্রতিবেশীরাও বুকফাটা আর্তনাদ করেছেন। বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকে হয়ে পড়েন শোকাতুর।
গত ২৯ মার্চ ২০২৬,রোববার রাত আনুমানিক ১১টা ৫৫ মিনিটে কুইন্সের উডসাইড এলাকায় ৬২তম স্ট্রিট ও রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ সংলগ্ন ক্রসওয়াকে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত নিশাত কুইন্সের ৫৫ স্ট্রিটের বাসিন্দা। তার পিতা উডসাইড বায়তুল জান্নাহ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা হেলাল আহমদ।
পুলিশের তথ্য মতে, একটি গার্বেজ ট্রাক রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ দিয়ে পশ্চিমমুখী চলছিল। পরে সেটি ডান দিকে মোড় নিয়ে ৬২তম স্ট্রিটের উত্তরমুখী লেনে প্রবেশ করার সময় ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হওয়া নিশাত জান্নাতকে ধাক্কা দেয়। চাকার নিচে পড়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ট্রাকটি পরিচালনা করছিল রয়েল ওয়াস্ট সার্ভিসের ৩৮ বছর বয়সী এক নারী চালক। দুর্ঘটনার পর তিনি ঘটনাস্থলেই অবস্থান করেন। নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের কলিশন ইনভেস্টিগেশন স্কোয়াড দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
নিহতের বড় বোন নওশিন জান্নাত সোমবার সকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বাবা-মা ভেঙে পড়েছেন। ঘরের ভেতর সবাই কাঁদছেন।’ তিনি আরো জানান, নিশাত জ্যামাইকার পারসনস বুলেভার্ডে একটি পার্কিং গ্যারেজে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন এবং সেখানে তিনি কালো ইউনিফর্ম পরতেন। রোববার রাতে কাজ শেষ করে ছোট বোনের জন্য কেক আনতে নিশাত উডসাইড ট্রেন স্টেশনে নামেন। এরপর আর কথা না হওয়ায় এবং বাসায় না ফেরায় নওশিন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তিনি নিশাতের ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে রাত প্রায় ২টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছান, যেখানে তিনি চারপাশে পুলিশ দেখতে পান।
নওশিন আরো বলেন, ‘আমার বোন খুব আশাবাদী ছিল। সে সবসময় মানুষকে বলতো, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে।’ নিশাতের ছোট আরো দুই বোন রয়েছে, যাদের বয়স ৯ ও ৪ বছর।
নিহত নিশাত জান্নাতের পরিবার ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ভিসায় আসেন। তাদের গ্রামের বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঢাকা দক্ষিণে।
এদিকে, ঘাতক গার্বেজ ট্রাক পরিচালনা কোম্পানি রয়েল ওয়েস্ট সার্ভিসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তারা তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, কুইন্সে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিবার ও স্বজনদের প্রতি আমাদের আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি ঘিরে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে উডসাইডের বাসিন্দা নিশাত জান্নাতের মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন ইউএস কংগ্রেস সদস্য গ্রেস মেং। ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, এই আকস্মিক ক্ষতিতে শোকাহত পরিবার ও প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য তিনি প্রার্থনা করছেন। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করা ফার্স্ট রেসপন্ডারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
গ্রেস মেং আরো উল্লেখ করেন, দুর্ঘটনার বিষয়ে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের চলমান তদন্তের আপডেটের দিকে তিনি নজর রাখবেন।
এদিকে কুইন্সের উডসাইড এলাকার বায়তুল জান্নাহ জামে মসজিদে ৩১ মার্চ মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর নিশাতের নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। এতে  ইমামতি করেন তার বাবা হেলাল আহমেদ।
জানাজায় অংশ নেন নিহতের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবসহ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ও অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির মানুষ। উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় অ্যাসেম্বলি সদস্যের প্রতিনিধিরাও। জানাযাস্থল জুড়ে ছিল শোকের ছায়া, আর কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই।
নিহতের বাবা হেলাল আহমেদ সন্তানের অকালমৃত্যুতে শোকে বাকরুদ্ধ। সন্তানের পরলৌকিক শান্তি কামনায় সবার কাছে দোয় চান তিনি।
কমিউনিটির নেতারা জানান, এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। তারা সড়ক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান এবং এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। একইসঙ্গে দুর্ঘটনার বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে কিনা, সে বিষয়ে পরিবার পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানান তারা।
জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় নিউজার্সির একটি মুসলিম কবরস্থানে। সেখানে তাকে দাফন করা হয়। শেষ বিদায়ে অংশ নিতে সেখানে উপস্থিত হন অসংখ্য স্বজন ও কমিউনিটির মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *