সংবাদপত্রের স্বাধীনতা : ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে আশার আলো, নাকি নতুন কালো ছায়া?



হ-বাংলা নিউজ:
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মোড় নেওয়া দিন। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসন শেষে পূর্ববর্তী সরকার ক্ষমতা ত্যাগ করে, এবং ব্যাপক জনবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে দেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয় সামরিক সহযোগিতায় গঠিত একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এই পরিবর্তনের মুহূর্তে সাধারণ মানুষ ও সাংবাদিক সমাজের মধ্যে নতুন করে এক বিশাল প্রত্যাশা জাগে—স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্ত গণমাধ্যমের পুনর্জাগরণ হবে বলে কিন্তু দেড় বছর পার হয়েও মাঠের বাস্তবতায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র যা ছিল কল্পনার অতীত ।

‘স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা’—সাংবাদিকদের এখন নতুন দাবি- সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এখন সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিবর্তে “নিজেদের স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা” দাবি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

দ্য ডেইলি স্টার–এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম চলতি সময়ে আল–জাজিরার ‘দ্য লিসেনিং পোস্ট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “বাংলাদেশে সাংবাদিকতা এখনো সর্বগ্রাসী আতঙ্কের মধ্যে বেঁচে আছে। কোনো গোষ্ঠীর মতের সামান্য বিরোধিতা করলেই হামলা বা হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়।”

তিনি আরও বলেন, “আজকের মূলধারার মিডিয়া তুলনামূলকভাবে স্বাধীন এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা অত্যন্ত সতর্ক — এমনকি শব্দচয়ন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। এটি মুক্ত গণমাধ্যম সংস্কৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী হলেও বাস্তবতা আমাদের সেখানে ঠেলে দিয়েছে।” (তথ্যসূত্র: দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেন অনুপস্থিত
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অনুপস্থিত থাকে যখন—

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বা ভয়ভীতি: ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি প্রভাবিত করে বা ভয় দেখায়।
সেন্সরশিপ ও দমননীতি: সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে ‘জাতীয় স্বার্থ’–বিরোধী বলে চিহ্নিত করে দমন করা হয়।
আইনি নিপীড়ন: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ইত্যাদি অপব্যবহারের মাধ্যমে সাংবাদিকদের আটক, হয়রানি বা নীরব করা হয়।
তথ্য নিয়ন্ত্রণ: ইন্টারনেট বন্ধ করা, ওয়েবসাইট অবরুদ্ধ রাখা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নজরদারি।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধতা: বিদেশী সাংবাদিক বা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত করা।
যখন এই সমস্ত শর্ত একত্রে এবং ধারাবাহিকভাবে বিদ্যমান থাকে, তখন কার্যত একটি দেশ “সংবাদপত্রের স্বাধীনতাহীন রাষ্ট্রে” পরিণত হয়।

নতুন প্রশাসনের বাস্তব পরীক্ষা
৫ আগস্ট ২০২৪–এর পর গঠিত সরকারের অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটুকু বাস্তব তা যাচাই করতে হলে কয়েকটি সূচক পর্যবেক্ষণ জরুরি:

যদি স্বাধীন গণমাধ্যম (যেমন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সমকাল প্রভৃতি) ও অনলাইন প্ল্যাটফর্ম সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে, বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কভার করতে পারে — তা একটা ইতিবাচক লক্ষণ।
কিন্তু যদি সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার বা কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে; গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম দখল বা বন্ধ করে দেওয়া হয় — তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, দেশটি এখনো মুক্ত সংবাদপত্রের অধিকার থেকে বঞ্চিত।
সম্পাদক পরিষদের উদ্বেগ
২০২৬ সালের ১লা ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত দৈনিক সমকাল–এ সম্পাদক পরিষদ এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ জানায়:
জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন ও সম্প্রচার কমিশন সম্পর্কিত দুইটি জরুরি অধ্যাদেশের খসড়া নির্বাচনের অল্প আগে প্রকাশ করা “অনভিপ্রেত ও অযৌক্তিক”।
সভাপতি নূরুল কবীর এবং সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ–এর স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, এসব উদ্যোগ সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে “আরও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রচেষ্টা” হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF), কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW)–এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বাংলাদেশ প্রায় একই অবস্থানে অবস্থান করছে —
সংবাদমাধ্যম কার্যত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আইনি বাধার মধ্যে থেকে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক মানের সংবাদপত্র স্বাধীনতা অর্জন করতে পারছে না।

উপসংহার: একাত্তরের মতো আরেক কলম যুদ্ধের আহ্বান
স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখনো অসংহত, বিচারব্যবস্থা বিতর্কিত এবং নাগরিক চরিত্র বিকাশের প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে বিপর্যস্ত হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপূর্ণতার দায় শুধুমাত্র শাসকবর্গের নয়—বরং সমাজের বিবেকবান নাগরিক ও সাংবাদিক সম্প্রদায়কেও তাদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

এখন সময় এসেছে নতুনভাবে স্বাধীন চিন্তা ও মুক্ত সংবাদযুদ্ধের—যেমন একাত্তরে হয়েছিল মুক্তির সংগ্রাম, আজ দরকার এক নতুন “কলম যুদ্ধ”, সত্য ও স্বাধীনতার পক্ষে।

লেখক: দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা, সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *