হ-বাংলা নিউজ: রাজনৈতিক পালাবদলের কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ প্রকল্পের বাস্তবায়ন গতি হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক সহায়তা কমানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত অর্থবছরে ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ কমানো হয়েছিল, তবে এবার আরও বেশি টাকার বরাদ্দ কাটছাঁট হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান সুবিধাসম্পন্ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বাড়িয়ে ডলার সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, সংশোধিত এডিপি তৈরির জন্য প্রকল্পভিত্তিক বৈদেশিক বরাদ্দ নির্ধারণে চার দিনের সিরিজ বৈঠক শুরু হচ্ছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) আগামী ৯ ডিসেম্বর থেকে এসব বৈঠক আয়োজন করবে, যেখানে ৫১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ইআরডি সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী।
এ প্রসঙ্গে, ইআরডির সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আজম বলেন, দেশে এখন একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতীতে রাজনৈতিক পালাবদলের মতো এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি এবং প্রশাসনে রদবদলও ঘটছে। নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে উন্নয়ন সহযোগীরাও অনিশ্চয়তায় আছেন, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং অর্থছাড়ের হার কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি সরকার ব্যয় সংকোচন নীতিতে চলছে, যার ফলস্বরূপ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে ৫.২৫ শতাংশ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে, সংশোধিত এডিপিতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ কমানোর শঙ্কা রয়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তার জন্য বরাদ্দ ছিল ১ লাখ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৩৫.৯৩ শতাংশ। তবে এই বরাদ্দ থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে সংশোধিত এডিপি ৮০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
এডিপির সংশোধিত বরাদ্দের জন্য ৩১ অক্টোবর মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে বৈদেশিক সহায়তাযুক্ত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির ভিত্তিতে বরাদ্দ নির্ধারণের জন্য ১০ নভেম্বরের মধ্যে চাহিদা জমা দিতে বলা হয়েছিল। ইতোমধ্যে অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ জমা দিয়েছে, যা অনুযায়ী এ বছর বরাদ্দ কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইআরডি সূত্র জানায়, ৯ ডিসেম্বর থেকে সিরিজ বৈঠক শুরু হবে। ১০ ডিসেম্বর ৯টি, ১১ ডিসেম্বর ১৪টি, এবং ১২ ডিসেম্বর ১৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে বৈঠক হবে। এসব বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে কোন প্রকল্পে কত বৈদেশিক সহায়তা বরাদ্দ প্রয়োজন।
গত অর্থবছরের মূল এডিপিতে বৈদেশিক সহায়তা খরচের লক্ষ্য ছিল ৯২ হাজার ২০ কোটি টাকা, যা পরে কমিয়ে ৮৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করা হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়েছিল। ইআরডি এবং আইএমইডি (বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বৈদেশিক অর্থায়নপুষ্ট প্রকল্পগুলোতে ধীরগতি বিরাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে ইআরডি জানায়, চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত উন্নয়ন সহযোগীরা ২৫ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ছাড় করেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ৩৬২ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের চেয়ে ৩৩৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার কম। এছাড়া, আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো বৈদেশিক সহায়তা থেকে খরচ করতে পেরেছে মাত্র ৮ হাজার ২১০ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ে ১১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা ছিল।
এছাড়া, ইআরডি, আইএমইডি এবং পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, অনেক প্রকল্পে সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ তদারকি এবং পিআইসি ও পিএসসি বৈঠক না হওয়া একাধিক জটিলতার সৃষ্টি করেছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণে জটিলতা, দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, উন্নয়ন সহযোগীদের আমলাতান্ত্রিক মনোভাব, প্রকল্প পরিচালকদের অদক্ষতা ও ঘনঘন পরিবর্তনসহ নানা কারণ প্রকল্পের বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
