নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
কুমিল্লার ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য নির্ধারিত ২২০ শতক জমি নামমাত্র মূল্যে হাতিয়ে নেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি এই জমি বিক্রির প্রক্রিয়ায় “অস্বাভাবিক অনিয়ম” ও “পরিকল্পিত জালিয়াতির” অকাট্য প্রমাণ পেয়েছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)-এর ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় এবং দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ঘটনার অধিকতর তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নিতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) অনুরোধ জানিয়েছে ইউজিসি।
জমি বিক্রির নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি
তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র এবং দাপ্তরিক চিঠিপত্র (স্মারক নং- ৩৭.০১.০০০০.১৩২.৪১.০২৬.২০.৯) থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের লক্ষ্যে কুমিল্লার পদুয়াবাজারে ২২০ শতক জমি ক্রয়ের জন্য ‘পার্ক ভিউ লিমিটেড’-এর সঙ্গে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকায় একটি বায়না চুক্তি (দলিল নং- ৮৬৬২) সম্পাদন করে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে এই জমির মূল্য বাবদ ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা পার্ক ভিউ লিমিটেডকে পরিশোধও করে। কিন্তু রহস্যজনকভাবে, পার্ক ভিউ লিমিটেড চুক্তির বাকি টাকা গ্রহণের আগেই এবং পূর্বের চুক্তি বলবৎ থাকাবস্থায় ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর উক্ত জমি মেঘনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘মেঘনা বেভারেজ লিমিটেড’-এর নামে মাত্র ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকায় রেজিস্ট্রি করে দেয়।
ইউজিসির পর্যবেক্ষণ: ‘ষড়যন্ত্র ও রাজস্ব ফাঁকি’
ইউজিসির একাডেমিক শাখা এই অস্বাভাবিক লেনদেনকে “ষড়যন্ত্রমূলক” হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে:
১. অযৌক্তিক মূল্য: যে জমির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে, সেই জমি ৩ বছর পর কীভাবে আরও কম দামে (১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা) অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হলো?
২. রাজস্ব ক্ষতি: বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দাম দেখিয়ে জমিটি রেজিস্ট্রি করায় সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে।
৩. অসাধু যোগসাজশ: তদন্ত কমিটি মনে করছে, পার্ক ভিউ লিমিটেড এবং মেঘনা বেভারেজের মধ্যে পরিকল্পিত যোগসাজশ ছিল, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আইনি বাধ্যবাধকতা ও বর্তমান অবস্থা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট’ বা পাবলিক প্রপার্টি হিসেবে বিবেচিত। ট্রাস্ট অ্যাক্ট ১৮৮২ এবং সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট ১৮৬০ এর অধীনে এই সম্পত্তি ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থে এভাবে হস্তান্তর করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
ইউজিসি ইতিমধ্যে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছিল। কিন্তু তাদের জবাবে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ইউজিসি এখন পুরো বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পাঠিয়েছে।
সংক্ষেপে জালিয়াতির চিত্র
| বিষয় | বিবরণ |
| মূল চুক্তি (২০১৫) | ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা |
| বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিশোধকৃত অর্থ | ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা |
| মেঘনা গ্রুপের ‘সাজানো’ ক্রয়মূল্য | মাত্র ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা (২০১৮ সালে) |
| প্রধান অভিযুক্ত | পার্ক ভিউ লিমিটেড ও মেঘনা বেভারেজ লিমিটেড |
| আইনি লংঘন | বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ ও ট্রাস্ট অ্যাক্ট ১৮৮২ |
এই জমি কেলেঙ্কারির ফলে ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইউজিসির এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে এখন মেঘনা গ্রুপ বড় ধরনের আইনি সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
